চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটকের সামনে ও নিষিদ্ধ এলাকাগুলোতে প্রকাশ্যে চলছে সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের বিক্রি। সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও বিদ্যমান আইন কার্যত উপেক্ষা করেই দিনের পর দিন এসব দোকান থেকে সিগারেট কিনছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব দোকানের মূল ক্রেতাই হচ্ছে কিশোর ও অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সন্দ্বীপের প্রায় সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজসংলগ্ন এলাকায় থাকা মুদি দোকান ও ভাসমান চায়ের দোকানগুলোতে খোলা প্যাকেট থেকে আলাদাভাবে সিগারেট বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় প্রকাশ্যে সিগারেট কিনলেও দোকানদারদের কোনো বাধা দিতে দেখা যায় না।
তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি ও বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে সন্দ্বীপে এই আইন বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।
নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানায়, “স্কুল ছুটির পর অনেকেই একসঙ্গে দোকানে গিয়ে সিগারেট কিনে খাই। দোকানদার কখনো বয়স জিজ্ঞেস করে না। কেউ কিছু বলেও না।”
একই এলাকার এক অভিভাবক বলেন, “আমরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাই পড়াশোনার জন্য। অথচ স্কুল গেটের সামনেই যদি সিগারেট পাওয়া যায়, তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রশাসন চোখ বন্ধ করে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাবে।”
এ বিষয়ে আরেক শিক্ষার্থীর এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না কখন আমাদের সন্তান এসবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। স্কুলের সামনে যদি প্রকাশ্যে সিগারেট বিক্রি হয়, তাহলে ঘরে বসে শুধু শাসন করে কোনো লাভ নেই। প্রশাসনকে আগে স্কুল এলাকার পরিবেশ ঠিক করতে হবে।”
আরেকজন অভিভাবক বলেন, “সন্তানদের হাতে আমরা পকেটমানি দিই পড়াশোনার প্রয়োজনেই। কিন্তু সেই টাকায় যদি তারা সিগারেট কিনতে পারে, তাহলে দায় শুধু আমাদের নয়। দোকানদার, স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসন—সবাইকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে।”
অভিভাবকদের মতে, পরিবারের পক্ষ থেকে সন্তানদের প্রতি নজরদারি ও সচেতনতা জরুরি হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাক বিক্রি বন্ধ না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
শিক্ষকদের মাঝেও রয়েছে গভীর উদ্বেগ। দক্ষিণ-পূর্ব সন্দ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যুগান্তরকে জানান, তাঁদের বিদ্যালয়ের ১০০ গজের মধ্যে অন্তত ২০টি চায়ের দোকান রয়েছে, যেখানে নিয়মিত সিগারেট বিক্রি হয়। স্কুল চলাকালীন সময়েই এসব দোকানে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায়।
তিনি বলেন, “বর্তমানে আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।”
তিনি আরও জানান, শিক্ষকদের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা না হলেও একবার একটি ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সেটি স্থায়ী কোনো সমাধান আনতে পারেনি।
সমাধানের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই শিক্ষক বলেন,
“আমরা নিয়মিত ক্লাসে শিক্ষার্থীদের ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝিয়ে বলি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—স্কুলের বাইরে দেদারসে সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। এটি বন্ধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। প্রশাসন চাইলে তবেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।”
সাউথ সন্দ্বীপ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবিএম ফিরুজ খান বলেন, “বর্তমানে সন্দ্বীপের শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এবারের পরীক্ষার ফলাফল আমাদের সবাইকে হতাশ করেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ কলেজ ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক আড্ডা ও খারাপ সঙ্গ।”
তিনি বলেন, “অধিকাংশ শিক্ষার্থী কারও কথা শোনে না। ক্লাস চলাকালীন সময়েও অনেক ছেলে শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকে; তাদের অনেককে আশপাশের দোকানে সিগারেট হাতে দেখা যায়।”
তিনি আরও বলেন, “এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি অভিভাবক সভার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৮–১০ জন। এমনকি চিঠি নিতে অনেক শিক্ষার্থী আগ্রহ দেখায়নি।”
প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনুরোধ করেও কলেজ চলাকালীন সময়ে দোকানগুলোতে আড্ডা ও সিগারেট বিক্রি বন্ধ করা যায়নি। এটি এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে রূপ নিয়েছে। প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।”
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি সন্দ্বীপ উপজেলা শাখার সভাপতি ও উত্তর সন্দ্বীপ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক নিঝুম খাঁন বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে সিগারেট ও তামাকজাত পণ্যের অবাধ বিক্রির বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর কোনো নজরদারি চোখে পড়ে না।”
তিনি বলেন, “এসব বিষয়ে কখনোই প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি বা নজরদারি করতে দেখিনি। আমরা সাবেক ওসি সাহেবদের অনুরোধ করে কিছু এলাকায় সিগারেটের আড্ডা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলাম।”
তিনি আরও জানান, “বর্তমানে স্কুল-কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাই অনেক ক্ষেত্রে সিগারেটের আড্ডা বসাচ্ছে, আর এতে মূল মদদ দিচ্ছে আশপাশের দোকানদাররা। বেশিরভাগ দোকানদার স্থানীয় হওয়ায় তাদের রক্তচক্ষুর ভয়ে অনেক শিক্ষকই এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারেন না।”
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এই সমস্যার দ্রুত সমাধানে প্রশাসনের উচিত নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে সিগারেট বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। আইন প্রয়োগ ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মংচিংনু মারমা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মনীতি ও সরকারি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। ‘ইউএনও সন্দ্বীপ’ নামে সরকারি ফেসবুক পেজে শিক্ষার্থীরা কী করতে পারবে আর কী পারবে না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই বিষয়টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে তার আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সহযোগিতা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সচেতন করা জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সভাপতি ও সংশ্লিষ্টদের ডেকে বসে এ বিষয়ে একটি কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।”
আইনগত ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, “যদি এসব উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে মোবাইল কোর্টসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”