• সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:১৩ পূর্বাহ্ন

চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ): ভোটের গরমে চাঙ্গা রাজনীতি

সন্দ্বীপ জার্নাল ডেস্ক: / ২৮ ৪ ৯
আপডেট: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ): ভোটের গরমে চাঙ্গা রাজনীতি

চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই রাজনীতির মাঠে উত্তাপ বাড়ছে। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই দ্বীপজুড়ে শুরু হয়েছে প্রাণবন্ত প্রচারণা। তবে প্রচারণার ধরন, উপস্থিতি ও কৌশলে দলভেদে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন মূলত তিন দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০১ জন। নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। দ্বীপাঞ্চল হওয়ায় ভোট গ্রহণ, ব্যালট পরিবহন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের ধারণা, দীর্ঘদিন পর দ্বীপবাসী তাদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি আগের তুলনায় বেশি হতে পারে।

বিএনপি শুরুতে নিজস্ব বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণসংযোগে গতি এনেছে। ২২ জানুয়ারি থেকে দ্বীপজুড়ে গণমিছিল ও ছোট সমাবেশের মাধ্যমে দলের তৎপরতা বেড়েছে। দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রতিটি ভোটারের কাছে দলের বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে। মনোনীত প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশা এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শুভেচ্ছা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা একটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চান, যেখানে কোনো উসকানি বা বিশৃঙ্খলার সুযোগ থাকবে না। সন্দ্বীপ যেহেতু মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ, তাই ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ যেন কেউ করতে না পারে—সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে বেশ গোছালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি। দলটির নেতাকর্মীরা শুরু থেকেই ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক সমন্বিত প্রচারণায় নেমেছেন। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রচারণায় শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণ অন্যদের তুলনায় বেশি চোখে পড়ছে। তাদের প্রচার কার্যক্রম মূলত ঘরোয়া বৈঠক, মতবিনিময় এবং উন্নয়ন প্রতিশ্রুতিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে।

অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আমজাদ হোসেন ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মাঠে নামার কৌশল নিয়েছেন। প্রতি দলে ১৫ থেকে ২০ জনের বেশি না রেখে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক প্রচারণায় মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সন্দ্বীপের প্রধান সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা, ভঙ্গুর স্বাস্থ্যখাত ও মাদকের বিস্তার। স্বাধীনতার এত বছর পরও মানুষকে কাঁদা মাড়িয়ে চলতে হওয়াকে তিনি ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে উল্লেখ করেন। নির্বাচিত হলে চিকিৎসা, শিক্ষা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

প্রচারণার তেজ বাড়লেও ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো প্রার্থীদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার অপেক্ষায় রয়েছে। এক সচেতন ভোটার বলেন, “ভোট দিতে আগ্রহ আছে। কিন্তু সন্দ্বীপের মূল সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা এখনো কেউ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেননি। আমরা উন্নয়নমুখী ও বাস্তবভিত্তিক প্রচারণা দেখতে চাই।” ভোটারদের প্রত্যাশা, নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম-৩ আসনের ভোটের সমীকরণ এবার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জটিল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজনের পাশাপাশি স্থানীয় ইস্যু ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দ্বীপাঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং উন্নয়ন ঘাটতির কারণে ভোটাররা এখন আর শুধু দলীয় পরিচয়ে ভোট দিতে আগ্রহী নন; তারা কার্যকর ও দায়বদ্ধ প্রতিনিধি খুঁজছেন।

বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রচারণার শেষ পর্যায়ে কে কতটা স্পষ্টভাবে সন্দ্বীপের বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারবেন এবং সেগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধানের রূপরেখা দিতে পারবেন, সেটিই ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সড়ক ও নৌ যোগাযোগ, আধুনিক চিকিৎসাসেবা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ—এই চারটি বিষয় ভোটের মাঠে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।

একই সঙ্গে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বাজার ও চায়ের দোকানের আড্ডায় রাজনৈতিক আলোচনা বাড়ছে। তরুণরা অতীতের রাজনৈতিক হিসাবের চেয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানান স্থানীয়রা।

রাজনৈতিক মহলের মতে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলে এবং ভোটার উপস্থিতি প্রত্যাশা অনুযায়ী হলে চট্টগ্রাম-৩ আসনের ফলাফল শুধু এই আসনের জন্য নয়, বরং দ্বীপাঞ্চলের রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে। সে কারণে প্রতিটি দলই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাঠে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে রাজনীতি এখন টগবগে। দলগুলোর কৌশল, মাঠের তৎপরতা এবং ভোটারদের প্রত্যাশা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ। শেষ পর্যন্ত কে বাস্তব পরিকল্পনা ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারেন—সেটিই নির্ধারণ করবে এই আসনের চূড়ান্ত ফলাফল।


Skip to toolbar