ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন বাণিজ্যিকীকরণ বেশি। এ কারণে শুধু বৈষয়িক কিছু বিষয় পড়ানো হচ্ছে। একজন মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, মানবিকতা জাগিয়ে তোলার জন্য যে শিক্ষা প্রয়োজন, সে দিকটি অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, অপরাধ বাড়ার সঙ্গে এর একটি বড় যোগসূত্র রয়েছে।’
ড. গোলাম রহমানের মতে, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কী করে বড় হওয়া যাবে, কী করে বেশি টাকা রোজগার করা যাবে, সে বিষয়গুলো শেখানো হয়। এ কারণে মানুষ নীতিবর্জিত হয়েও সাফল্য চিন্তা করে। ভোগবাদী সমাজে মানুষ কী করে ইনভেস্ট করবে এবং লাভ পাবে, সেদিকে চিন্তা করে বেশি। এ অবস্থায় মানুষ আর ভালো-মন্দ বিবেচনা করে না। ফলে মানুষ ঘুষ, দুর্নীতি, ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’
ড. গোলাম রহমান আরো বলেন , ‘আমাদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বস্তরে যদি নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায়, যদি পেশাগত নীতি-নৈতিকতা যথাযথভাবে শেখানো সম্ভব হয়, তাহলে সব অপরাধই কমিয়ে আনা সম্ভব। কারণ প্রতিটি অপরাধ একটি আরেকটির সঙ্গে জড়িত এবং অপরাধ প্রবণতা একটি সামগ্রিক ব্যাপার।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের তুলনায় দেশে ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০১৮ সালে ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৭৩২টি এবং ২০১৯ সালে ছিল ১ হাজার ৪১৩টি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পুলিশ বলছে, ২০১৯ সালে সারা দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মোট মামলা হয়েছে ৬ হাজার ২১৫টি। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৬১৭।
অপরাধ কমানোর লক্ষ্যে সরকার সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন আইন সংশোধন করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করেছে। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, এ ধরনের অপরাধে কিশোররাও জড়িয়ে পড়ছে। যাদের ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।
কেন কিশোর বয়সেই একজন শিক্ষার্থী ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে? এ নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের মাঝে এখন সব সময় ভালো রেজাল্ট করার তাড়া থাকে। বাবা-মা প্রতিযোগিতায় থাকেন সন্তানকে কী করে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করানো যায়। এটা করতে গিয়ে তারা অনেক সময় অনৈতিক কাজেও জড়িয়ে পড়ে। কোনো কোনো অসাধু শিক্ষক প্রশ্ন ফাঁসও করেন। এটা একজন শিক্ষার্থী কিন্তু বুঝতে পারে। তার মধ্যে অনৈতিকতার বীজ তখন থেকেই বপন করা হয়ে যায়। ফলে যেকোনো অপরাধ করতেই তার মন আর বাধা দেয় না। কিন্তু আমরা এর বিপরীতে তেমন কোনো নৈতিক বা মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে পারি না। কারণ আমাদের স্কুলগুলোতে বাধ্যতামূলক শিক্ষার বাইরে তেমন কিছু পড়ানোর বা শেখানোর সুযোগ হয় না।’
একই রকম কথা বলেন ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাইস্কুলের একজন শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু পরীক্ষার্থী তৈরি করছি। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর চিন্তা থাকে কীভাবে জিপিএ-৫ পাওয়া যায়। অভিভাবক এবং শিক্ষকদেরও একই ধ্যান-জ্ঞান থাকে। এর ফল হলো ভালো মানুষ তৈরি থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।’
প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শিক্ষাবিদ ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুলগুলোতে নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা দরকার। আমাদের স্কুল পর্যায়ে নৈতিকতা শিক্ষা, দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ বিষয়গুলোকে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এটা শুধু পড়ানো নয়, এর পরীক্ষা নেয়া এবং কে কতটুকু শিখল, তার মূল্যায়ন করা দরকার। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয় হিসেবে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার সুযোগ কিছুটা কম। কিন্তু এখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক কাজের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর নৈতিকতা ও মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা দরকার। এটাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।’
বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘শুধু অঙ্ক, ইংরেজি, ইতিহাস পড়িয়ে একজন শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, সম্প্রীতি। কিন্তু বছরের পর বছর এই বিয়ষগুলোকে আমরা অবহেলা করেছি। আমরা শুধু জিপিএ-৫-এর পেছনে দৌড়িয়েছি শিক্ষার্থীদের। ফল হিসেবে নৈতিকতাবর্জিত মানুষ তৈরি হচ্ছে। মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে, কিন্তু ভালো মানুষ তৈরি হচ্ছে না।’
সারাক্ষণ